বাংলাদেশে জন্ম নেয়া কোটি কোটি মানুষের মত আমারও সবচেয়ে প্রিয় গান 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি'। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর তাঁর সংগীত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে প্রতিটি বাঙ্গালীর জীবন।
ছেলেবেলা কেটেছে আনন্দ হাসি খেলায় - বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরী স্কুলের উচ্ছ্বল প্রাঙ্গণে। গানের ক্লাসে কত কত গান শেখা! 'ফুলে ফুলে ঢোলে ঢোলে', 'কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা', কিংবা শরতের কোনো সকালে 'আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা'। হয়তোবা বাংলা ক্লাসে 'বীরপুরুষ' হয়ে মা'কে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়ার কল্পনা।
প্রথম কৈশোরে মন যখন মগ্ন পাশ্চাত্য সংগীতের উন্মাদনায় - ঠিক তখন একজন কাছের মানুষ ছোট ছোট চিরকুটে কবিগুরুর গান লেখা শুরু করলো। 'জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণা ধারায় এসো' - কতটুকুই বা বুঝতাম তখন! তারপরও কি যে ভালোলাগা! কিছুটা গান গুলোর শব্দখেলায়, অনেকটাই হয়তো ছোটোবেলার নিষ্পাপ আবেগে।
তারপর সময়ের দ্রুত ছুটে চলা। প্রবাসী ছাত্র জীবনের একাকীত্ব, নতুন বন্ধু-বৃ্ত্ত তৈরি করা - প্রতিদিন নতুন গান গীটারে তুলতে হবে - এই কথা রাখার জন্য আবারো কবিগুরুর শরণাপন্ন হওয়া। 'পুরানো সেই দিনের কথা' - 'মায়াবন বিহারীনি' - 'সেদিন দু'জনে' আরো কত কত সুর। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার মত। কখনো সুমনের গানের কথায়, হুমায়ুন আহমেদের কিংবা সুনীল-সমরেশের লেখায়। তারপর কোন এক সকালে, ঘুম ভাঙা এক ছুটির দিনে শ্রাবণী সেনের কন্ঠে বেজে ওঠা - 'মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরে, একেলা রয়েছ নীরব শয়ন প'রে, প্রিয়তম হে জাগো জাগো জাগো'। কবিগুরুর সঙ্গে আমার হৃদয়ের যোগাযোগ সেই মুহুর্তেই।
অনেক অনেক বিষন্ন মুহুর্তে - গীতবিতান মনকে শান্ত করেছে। আবেগের অসীমত্তকে স্পর্শ করার আর কোনো মাধ্যম আমি খুঁজে পাই নি। সেই গীতবিতান কে সবার কাছে পৌঁছে দেবার প্রয়াসে এই ওয়েব সাইট এর জন্ম। আমি চেয়েছি অনলাইন এক Database থাকবে, যেখান খেকে যখন খুশী যেকোনো রবীন্দ্র সংগীতের কথা খুঁজে পাওয়া যাবে। জীবিকা এবং জীবনের কারণে আমরা অনেকেই তো এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি পৃথিবীর নানা প্রান্তে। 'গীতবিতান' এর গ্রন্থ সংস্করণ তো সবার কাছে সব সময় থাকছেনা। কিন্তু আবেগতো আর স্থান-কাল যাচাই করেনা সবার ক্ষেত্রে।
অনলাইন গীতবিতান (gitabitan.com) এর যাত্রা শুরু আজ পঁচিশে বৈশাখ, ১৪১৬। কবিগুরুর দু'হাজার এর বেশী গানের সংকলন তো একদিনে সম্ভব নয়। শুরু করছি খুব পরিচিত এবং প্রিয় কিছু গানের কথা দিয়ে। কিছু সেচ্ছ্বাসেবী বন্ধুর সাহায্যে আশা করছি দিনে দিনে এই database সমৃদ্ধ হবে। বাংলা ভাষায় website এবং database তৈরি করতে গিয়ে হয়তো বেশ কিছু ভুল থাকবে। আশা করছি পাঠকের ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি পাবো এই সব ছোট-খাটো ভুল ত্রুটি-র ক্ষেত্রে। আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে - যতটুকু পারা যায় ভুলগুলো দ্রুত সংশোধন করা।
কবিগুরুর ঋণ তো আমরা শোধ করতে পারবোনা - কিন্তু তার গানের কথা বেঁচে থাকবে internet এ। তাতে যদি কখনো একজনেরও মন ভালো হয় - তাহলেই সার্থক হবে এই প্রয়াস। কবিগুরুর জন্মদিনের সেই গানটি দিয়ে শেষ করছি -
'তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদঘাটন সূর্যের মতন
রিক্ততার বক্ষভেদী আপনারে কর উন্মোচন
ব্যক্ত হোক জীবনের জয়
ব্যক্ত হোক তোমা মাঝে অসীমের চির বিস্ময়
উদয় দিগন্তে শংখ বাজে মোর চিত্তমাঝে
চির নূতনেরে দিলো ডাক
পঁচিশে বৈশাখ - হে নূতন'
সবাইকে ১৪৮-তম রবীন্দ্র জয়ন্তীর শুভেচ্ছা।
আব্দুল্লাহ্ আল আমীন পিয়াল
অস্টিন, টেক্সাস
২৫ শে বৈশাখ, ১৪১৬
অনলাইন গীতবিতান শেষ করার আনন্দ
সবাইকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অভিনন্দন এবং ভালোবাসা - গীতবিতান এর বাণী অন্তর্ভুক্তি সমাপ্ত করার জন্য। এই বছরেই কবিগুরুর ১৪৮ -তম জন্মবার্ষিকীতে শুরু করেছিলাম আমরা এই পথচলা। সে দিন ছিল ২৫ বৈশাখ। আজ ৭ ভাদ্র। মাত্র তিন মাস তের দিনে প্রায় ২২শত গানের বাণী সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা সফটওয়্যার টুল দিয়ে ডাটাবেসে প্রবেশ করানো যাবে - এটা আমার ধারনার অনেক বাইরে ছিল। এই অসাধ্য কে সাধ্য করেছেন আপনারা সবাই।
সুলতান ভাইয়ের কথা কি লিখবো? ১৩৬৭ গান! আপনি শুধু গান গুলো সংযোজনই করেন নি; খুবই সহজভাবে আপনি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন আমাদের বাকী সবাইকে.. ব্যস্ততার চুড়ান্ত পর্যায়ে থেকেও কিভাবে সময় বের করা যায় - পারিবারিক, জীবিকা, এবং সামাজিক দায়িত্ব পূরণ করেও কিভাবে আরেকটা ভালোবাসাকে (passion - শব্দটার ভালো কোনো প্রতিশব্দ এই মূহুর্তে মনে পড়ছে না) সময় দেয়া যায় - এটাই তার উদাহরণ।
আন্দালিবের আবির্ভাব এবং দ্রুতগতি তে ২১৬ টা গানের অনুপ্রবেশ - আমার মত আরো অনেককেই বিস্মিত করেছে। শিখা আপু ছিলেন গোড়া থেকেই অটল (আবারো consistent - শব্দটার ভালো কোনো প্রতিশব্দ এই মূহুর্তে মনে পড়ছে না)। তার প্রবেশ করানো ১৩১ টা গান গীতবিতান কে এতো তারাতারি সমাপ্তির কাছে নিয়ে এসেছে।
ক্যারিনা, গালিব ভাই, ফারাহ আপু, জনি, জুন, মাসুদ ভাই আর সাইফুল ভাই - অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাদের সবার হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য। শিশুর জন্মদেয়ার মত এতো বড় শারীরিক সীমাবদ্ধতা, জীবিকা সংক্রান্ত দুঃশ্চিন্তা,এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে এতো ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও আপনারা সবাই যে যখন পেরেছেন সাহায্য করে গেছেন আন্তরিকতায়। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করার দুঃসাহস আমার নেই। তবুও ধন্যবাদ, তবুও অভিনন্দন - হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায়।
কবিগুরুর অবদানের ওপর কাজ করে গেছেন পৃথিবীর অনেকে অনেক সময়। প্রথম অনলাইন বাংলা গীতবিতান ডাটাবেস করার উল্লাসটা না হয় আমাদের-ই থাকলো! আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য কিছু তো একটা রেখে গেলাম! এই প্রাপ্তির আনন্দটা ক'জনের ভাগ্যে জোটে?
মাঝে মাঝে কল্পনা করতে ইচ্ছে করে - কবিগুরু যদি আজ বেঁচে থাকতেন - কী ভাবতেন তিনি?
সবাইকে অনেক অনেক ভালোবাসা।
আব্দুল্লাহ আল আমীন পিয়াল
৭ ভাদ্র, ১৪১৬
অস্টিন, টেক্সাস